বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১০

তবু বৈশাখ : ১৫ এপ্রিল ২০১০

আসে বৈশাখ
দহনে পোড়াতে জীবন
ঝড়ে উড়াতে ঘর
বরণে তবু তার কত আড়ম্বর
কত উচ্ছ্বাস, কত রঙ,
কত হীরেমন নীলাঞ্জনে লুটায়;
আলোকিত আধুনিকার বসনে সাংস্কৃতিক উৎসব,
আর পথকিশোরীর বসনে বাতাসের স্বাধীনতা -
শকুনের আনাগোনা,
পথের ধুলোতে থাকা নিরন্ন শিশুর -
চোখের পান্তায় ঘাই মারে রূপোলী ইলিশ, বারে বারে
তাই মেলার মাঠে বোতল কুড়োতে কুড়োতে তার হাত -
অজান্তেই চলে যায় ভদ্রলোকের পকেটে, আর প্রহার,
ভেতর - বাহির রক্তাক্ত তার;

বিবেকের অবশিষ্ট ক্লেদ হ'তে উঠে আসা -
সর্বশেষ স্লোগান, মিলিয়ে যায় ভোগবাদের হুংকারে,
তাদের শৈল্পিক নাটুকেপনায়
প্রধান অতিথি পহেলা বৈশাখ,
তবু বৈশাখ ।

সোমবার, ১২ এপ্রিল, ২০১০

কথন : ১২ এপ্রিল ২০১০

শব্দরা কেবল পালায়
ঘর ছাড়ি, ছাড়তে হয়
নেহাত এজন্যেই
ভাল্লাগেনা তোদের শহর আর
সভ্যতার উগ্র গন্ধ আমায় কাঁদায়,

পৌনঃপুনিক হোঁচটে
তোদের গড়া ইমারতগুলোয় হাঁ করে তাকানো -
মুগ্ধতার ভান করা,
তবে ঘাসফুল-গন্ধে মাতাল মনে মুগ্ধতা আসে না,
মুগ্ধতা মূলতঃ নেই,

বিলবোর্ডের স্তনে আধুনিকতার দুর্দান্ত উৎসব
তবু বড় রূক্ষ, বড় স্থূল এই যাপিত জীবন,
তোদের ভাবাতে, তোদের কাঁপাতে
প্রত্যেকের জন্য একটা ক'রে অশ্লীলতা চাই, তাই-
পয়মন্ত ভাবনারা অশ্লীলতা ছোঁবে,
ওদের হবে বুড়িগঙ্গায় বিসর্জন -
দোহাই বুড়িগঙ্গার ক্লেদ
টের যেন না পায় কর্তৃপক্ষ -
ভাবনারা অশ্লীলতা বুঝুক
সস্তা সুখ চেটে নিতে শিখুক ।।

ধূমশলাকার পূজারী

আসুন, গল্প শুনুন
সীমাবদ্ধ একজন, ভাবনা অসীম
অস্থির দুখবিলাসী এক
ধূমশলাকার পূজারী,
ধোঁয়ার কুয়াশায়, তিনি -
হাঁটেন, হয়ে লুসিফর;
দুপুর আহার তার -
চৌকোণা দুটি রুটি
শেষে, তবু অবশিষ্ট আধেক,
ছেঁড়া খামে লিখে যান, সচেতন মস্তিষ্কে -
ঢালেন উত্তপ্ত চা, সদ্যোজাত কবিতায়;
এরপরও তিনি কবি এবং কবি ।

দৃষ্টিতে, তার আকাশে তাকানো মৃত -
পিষে যাওয়া ফুল, শুয়ে থাকা পাতা,
ধূমশলাকার লাশ...
রাত বড়ো ঘুমহীন, যাতায়াতময়,
সকাল মূর্ছিত, দুপুর জরাগ্রস্ত,
বেদনার বিকেল ছোটে উত্তপ্ত কবিতায়,
ভীনদেশী গানে, ধোঁয়ার ক্যালকুলাসে,
রীতিমতো ছেলেমানুষ, অ-বৈষয়িক,
তবু অনায়াসে তারে ভালবাসা যায়,
রাখা যায় হাত, তার সংবেদনশীল কাঁধে -
কেননা তিনি কবি এবং কবি
পাশাপাশি ধূমশলাকার পূজারী ।।

সোমবার, ৫ এপ্রিল, ২০১০

সমুদ্রবাড়ি (৫ এপ্রিল, ২০১০)

সমুদ্রবাড়ি যাব হেঁটে
সঙ্গে যাবে ক'খানা শীত আর বসন্ত
পাড়ি দিয়ে হাজার ক্রোশ মেঠোপথ, আলপথ
সমুদ্রবাড়ি যাব
পার হয়ে শত শত মাঠ, সর্ষেক্ষেত,
ধনেপাতা সুখ,
রাঁধাচূড়া ঝোপ,
সমুদ্রবাড়ি যাব
প্রতীক্ষায় কুমারী সৈকত;

সারি সারি ভুট্টার ক্ষেত, রূক্ষ শুষ্ক মাঠে
জড়োসড়ো হয়ে বাঁচে বিন্নি ধানের চারা,
কিষাণীর অশ্রু ছলকে মেশে ভোরের শিশিরে,
লাউয়ের মাচান হতে উঁকি দেবে কাঠবিড়ালের ছানা,
বাথানের মায়া ভুলে বাঁশিতে দরিয়ার ঢেউ তুলে
আকাশ ছোঁবে রাখাল,
এঁকে বেঁকে গ্রামের পর গ্রাম ধুয়ে
কলকল নদী আমার সঙ্গে
সমুদ্রবাড়ি যাবে,
ঘাটে ঘাটে তাই বাঁদিয়ার উৎসব;

সমুদ্রবাড়ি যাব,
চেটেপুটে নুনপানি শুভ্র ফেনার ঢেউ
গাভীন হবে কুমারী সৈকত,
গাঙচিল স্বপ্ন,
কচ্ছপ সাধ,
সমুদ্রবাড়ি যাব
গেলে যাক শীত-বসন্ত
যত খুশি, যত দূর ।।

রবিবার, ৪ এপ্রিল, ২০১০

ভোগগ্রস্তের রূপোলী হারপুণ (৪ এপ্রিল, ২০১০)

কবি হলে আহার্য্য ছিল গনগনে রোদ্দুর
নিতান্ত মানুষ ওরা রোদ ভুলে ছায়াজুড়ে বিদ্যমান,
কবি হলে উপাখ্যান লিখে যেত দূর্বার প্রতিটি পৃষ্ঠায়
পরিপাটি দুঃখবোধ হতে মৃতজন পরিবৃত শহর
নিতান্ত মানুষ বলে নিভৃতে শীতল বাস্তুতে
বেশ্যার বিশ্বস্ত বাহুতে
ভীনগ্রহী ঈশ্বরীকে খুঁজে পাওয়ার ভান করে,
কবি হলে বেদনা কুড়োত এলোমেলো চুলে
নিতান্তই মানুষ তাই উল্লাসে মেতে সুখ খোঁজে
সীমিত অনুভূতিতে সংগীত নয়, ওরা শোনে সাইরেন;
কবির মস্তিষ্কে বিদ্রোহ
আর ওদের শরীরের গল্পে
জৈবিক চরণের নীচে লাল দাগ
দেয়ালিকাময় জমাট রক্তে মানুষের ইতিহাস,
সর্বনাশা প্রাচীন আগুন
ভোগগ্রস্তের রূপোলী হারপুণ ।।

বৃহস্পতিবার, ২৫ মার্চ, ২০১০

প্রিয় নুরুন্নাহার (২৫ মার্চ ২০১০)

কিছুক্ষণ হল, গুঞ্জন থেমেছে কারখানার
পুরাতন কেরোসিনের গন্ধে বেলাশেষের ক্লান্তি
আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে ঘামে ভেজা শরীর
তবু ঘুম নেই,
তোমার আমার বোনা যৌথ স্বপ্নগুলোর ভবিষ্যত
আমাকে ভাবায়,
নিকোনো উঠোন, গাঁদাফুল-নয়নতারার ঝোপ
একটি বকুলগাছ, তোমার গায়ের গন্ধ
ভেসে আসে হাজার হাজার মাইল,
তুমি বোধহয় কাঁদছ...

বছর ঘুরে গেল
হালকা খবর আসে
ওইপাড়ে কিছু একটা হযে গেছে বড়সড়
যুদ্ধ বাঁধেনি তো...
আদৌ নিশ্চিত নই
চিঠিখানা তোমার হাতে পৌঁছুবে কিনা,
বুকের ভেতর চাপা ভয়
কি হবে জানিনা কিছুই,

রোজ সাইরেনের চিৎকারে ঘুম ছুটে যায়
মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্নেও... তারপর,
প্রতিটি দিন একই রকম, যান্ত্রিক, যন্ত্রণার,
ভাবনার শক্তিটাও চুরি যায় কখনও কখনও,
শেখ মুজিব কি পারবে...
দেশে ফেরার কোন পথ নেই
কিছু একটা হয়েছে বোধহয়..
বাবা-মা-বোনটা,
তুমি-আমাদের যৌথ স্বপ্নগুলো
সব কি আছে, জায়গামতোন...
সূর্য কি আলো দিচ্ছে আগের মতন ?

বুধবার, ২৪ মার্চ, ২০১০

বেঁচে থাকার বৈধতা (২৪ মার্চ ২০১০)

একটি ভ্রূণের সাফল্যের পেছনে
চাপা পড়ে থাকে -
আরো অসংখ্য সম্ভাবনার মৃত্যু,
আর একটি শিশুর আগমনী আনন্দে
চাপা পড়ে যায় জন্মদাত্রীর যন্ত্রণা ;
কত যুদ্ধে, কত সংগ্রামে
রাশি রাশি দুঃস্বপ্ন পাশে ঠেলে
শুভ্র, সুন্দর, আর অর্থবহ কিছু স্বপ্ন নিয়ে
একটি শিশু সম্পূর্ণ মানুষ হয়,
আলাদা মানুষগুলো কাঁধে কাঁধ মিলায়
সভ্যতা গড়ে পৃথিবীতে, বাঁচে ;
তবু এই বেঁচে থাকার বৈধতা কতটুকু ।

পৃথিবীর স্থল - বায়ু - জল
যোগ্যতমের অধিকার,
ব্যর্থ এবং মৃতদের
দেহাবশেষের উপর দাঁড়িয়ে -
মানুষ বেঁচেছে, বেড়েছে, সভ্য হয়েছে,
সভ্য মানুষ পা ফেলল
নতুন নতুন সভ্যতার জন্ম দিল -
বিগত সভ্যতার ধ্বংসস্তূপের উপর,
কিন্তু তার চলার পথে
কখনও ঘাস জন্মাল না ।

সবুজ বন ছিল, বুনোফুল ছিল,
পাহাড় ছিল, তার গায়ে -
ঝরণা আর মেঘ ছিল,
আধুনিক মানুষের সঙ্গমে
পুড়ে গেল বনের পর বন
ধ্বংস হল পাহাড়ের পর পাহাড়,
গাঢ় নীল আকাশ
হয়ে গেল ধোঁয়াটে, বিষণ্ন,
পর্যাপ্ত দূষণে দূষিত আজ
পৃথিবীর স্থল - বায়ু - জল,
দূষিত আকাশ হতে বৃষ্টির মতন -
আগুন ঝরছে কেবল ।

ক্রমশঃ কোন হরিণ থাকবেনা
ক্রমশঃ কোন দোয়েল উড়বেনা
কখনও কোন শাপলা ফুটবেনা
বিষাক্ত স্রোতে আসবেনা বেড়াতে -
কোনদিন রূপোলি ইলিশ,
ধীরে ধীরে মৃত পৃথিবীর
জরায়ূ চিরে জাগবে প্রকৃতি
ফুঁসে উঠে গুঁড়িয়ে দেবে তাসের সভ্যতা,
হিসেব চাইবে কড়ায় গন্ডায়,
রূল জারি করবে -
আমাদের বেঁচে থাকা কেন অবৈধ হবেনা ।