মাগো -
আমি তোমার খোকন
আমার ওপর অনেক রাগ, তাই না মা
বলেছিলাম ফিরব, পারলাম না...
এখন সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা
চিঠিটা যেন শেষ করে যেতে পারি,
ওরা অনেক চেষ্টা করল মা, পারল না...
গুলিটা এমন অজায়গায় লেগেছে
রক্ত আর থামছেই না, ওরা বলেছে -
শেষ রাত অবধি বাঁচলে ভাগ্য,
বলেছিলাম না মা,
দেশটা একদিন স্বাধীন হবেই...
আমি নেই তো কী হয়েছে
আরো কত লক্ষ লক্ষ সন্তান তোমার,
জানি মাগো -
চিঠিখানা পড়তে পড়তে
তোমার চোখের জল বাঁধ মানবে না,
কিন্তু লিখতে তো হবেই আমায়,
রক্ত অনেক লাল মা, তবু -
যুগে যুগে স্বাধীকারের জন্যে
মানুষ তার বুকের রক্ত দিয়েছে,
তবু মানুষ কেন মানুষকে খুন করবে...
মানুষ কেন মানুষকে বাঁচতে দেবে না...
কেন এক ভাইয়ের রক্তে আরেক ভাই
হাত রাঙাবে, তারা কেমন মানুষ...
তুমি আমার জন্মদাত্রী মা
এদেশ আমার জন্মভূমি মা
তাই তো যুদ্ধে এলাম
মা'কে মুক্ত করতে যুদ্ধে এলাম,
হায়েনার পালকে নিশ্চিহ্ন করতে
যুদ্ধে এলাম, বোনের অপমানের শোধ নিতে
যুদ্ধে এলাম, কিন্তু মাগো -
শেষটা দেখে যেতে পারলাম না ।
মাগো, কত্ত ভালবাসি তোমায়, জানো...
তুমি কাঁদবেনা বলো,
মাথা উঁচু করে হাঁটবে তুমি,
যে সন্তানেরা তাদের মাকে হারিয়েছে -
তাদের বুকে তুলে নেবে,
আমার ছোট্ট ভাইটিকে বলো...
তার ছেলে-মেয়েকে সে যেন -
আমার কথা, আমাদের কথা বলে,
ওরা যেন আমাদের মনে রাখে...
যে মেয়েটিকে
তুমি তোমার বউ বানাতে চেয়েছিলে,
তাকে বলো -
সে যেন আমায় ক্ষমা করে,
নতুন দেশের নতুন মাটিতে
আমার নামে
একটা দোপাটির চারা লাগিও,
আর তোমরা ভাল থেকো ।
বুধবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০০৯
বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০০৯
একাত্তরে আমার পিতা রাজাকার ছিলেন
আমার একজন পিতা আছেন
আমি তাকে আব্বা বলে ডাকতাম...
আমার খুব মনে আছে,
তিনি যখন কোরান পড়তেন -
সুবেহ সাদিকের স্বর্গীয় নীরবতার মধ্যে
তার কণ্ঠস্বর অদ্ভুতভাবে বেজে উঠত
তার সৌম্য অবয়ব হতে কোন এক
অন্য ভুবনের আলো ঠিকরে বেরুতে দেখতাম -
আমি, তখন ভুল শুনতাম
আমার দেখায় ভুল ছিল ।
আমার একজন আম্মাও ছিলেন
আমি তাকে কোনদিন হাসতে শুনিনি...
সারাটা বছর থাকতেন রোগাক্রান্ত
পর্দার আড়ালে দুর্বল, শীর্ণ, কালো
কোন গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে
আম্মার ফোঁপানো কান্নার শব্দ শুনতে পেতাম,
আমি তাকে বেশিদিন আম্মা ডাকতে পারিনি -
আমার বয়স যখন ছয়,
পিতা দ্বিতীয়বার বিবাহ করলেন...
কিছুদিন পর মারা গেলেন আমার আম্মা,
আমার আম্মা ...
আমার পিতার আরও তিন ছেলে ছিল
তাই বোধহয় তিনি আমাকে -
আদর করার মত যথেষ্ট সময় পাননি
নাকী আমি কালো ব'লে ভ্রু কুঁচকাতেন...
আজও জানি না,
একা একা বড় হয়েছি, খুব একা...
বয়স তখন উনিশ ছুঁই ছুঁই...
শেখ মুজিব মুক্তির ডাক দিলেন,
আগুন জ্বলা তার অনবদ্য ভাষণে...
আমার পিতা এই দেবতার মতন ব্যক্তিকে মোনাফেক, কাফের
এবং ইসলামের ঘোরতর শত্রু হিসেবে সাব্যস্ত করলেন,
পাকিস্তান.. পাকিস্তান.. মাতম শুরু করলেন
এপ্রিলের মাঝামাঝি, পাকসেনারা গ্রামে আসতে লাগল
আমার পিতার সেকী উচ্ছ্বাস,
ভীষণ তৎপর হয়ে উঠলেন তিনি...
পাকসেনাদের সামনে তিনি এমনভাবে গলে গলে পড়তেন যে -
ভ্রম হত.. তারা বোধহয় আল্লাহর পাঠানো ফেরেশতা...
এই ফেরেশতাদের ছিল পিশাচের মতন ক্ষুধা.
সব খেত ওরা, স-ব... যাকে সন্দেহ হত, গুলি করে মারত...
মেয়েদের ধরে ধরে খুবলে খেত...
এক দুপুরে পিতা, আমার ছোটখালাকে নিয়ে গেলেন -
পাকসেনাদের ক্যাম্পে, আমি তাকে আর কোনদিন দেখিনি...
আমার জগতটুকু ভীষণ এক আগুনে পুড়িয়ে দিলো কেউ...
আমি সেই রাতিই পালিয়ে গেলাম... যুদ্ধে গেলাম...
আমি তখন রংপুরের পথে,
লোক মারফত জানতে পারলাম -
মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের শাস্তিস্বরূপ
পিতা আমায় ত্যাজ্য ঘোষণা করেছেন,
আর এই মহান কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ -
পাকসেনারা তাকে আলবদর বাহিনীর কমান্ডার বানিয়েছে
আমার পিতা...
যুদ্ধের সেই দিনগুলো আজও চোখের সামনে জ্বলজ্বল...
রক্তের মহাসমুদ্র সাঁতরে আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হ'ল ।
আট মাস পর.. ডিসেম্বরের আঠারো তারিখ..
গ্রামে ফিরলাম আমি,
দেখলাম আমাদের বাড়িটাকে পোড়ানো হয়েছে,
শুনলাম পিতার দ্বিতীয় স্ত্রী, তিন পুত্র কেউ-ই আর বেঁচে নেই,
পিতাকে বেঁধে রাখা হয়েছে.. মেরে ফেলা হবে হয়তো...
পিতা আমায় দেখে চমকে উঠলেন...
তার সমগ্র শরীর কোন এক উচ্ছ্বাসে কেঁপে কেঁপে উঠছিল,
আমি পিঠ সোজা করে দাঁড়ালাম,
ভাবলাম মেরেই ফেলুক.. এই পশুটার শাস্তি হওয়া উচিত...
পরে আর পারিনি...
পিতা স-ব ভুলে গিয়ে আমায় গ্রহণ করতে চাইলেন
কিন্তু আমি তার কাছে আর ফিরে যেতে পারিনি...
আমি এখন এক সুতার কলে কাজ করি,
ভয় এবং দুশ্চিন্তার বিষয় এই, পিতা এখন
মস্ত এক নেতা হয়েছেন, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে
তার এখন বিলাসী জীবন...
মন্ত্রীও নাকি হয়ে যেতে পারেন সামনের নির্বাচনে...
কী করেছি আমি... কত বড় পাপ...
অপরাধবোধে, এখন নিজের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারিনা,
পারিনা...
আমার পিতা এখনও আছেন -
আমি ভুলেও তাকে আব্বা বলে ডাকিনা...
আমি তাকে আব্বা বলে ডাকতাম...
আমার খুব মনে আছে,
তিনি যখন কোরান পড়তেন -
সুবেহ সাদিকের স্বর্গীয় নীরবতার মধ্যে
তার কণ্ঠস্বর অদ্ভুতভাবে বেজে উঠত
তার সৌম্য অবয়ব হতে কোন এক
অন্য ভুবনের আলো ঠিকরে বেরুতে দেখতাম -
আমি, তখন ভুল শুনতাম
আমার দেখায় ভুল ছিল ।
আমার একজন আম্মাও ছিলেন
আমি তাকে কোনদিন হাসতে শুনিনি...
সারাটা বছর থাকতেন রোগাক্রান্ত
পর্দার আড়ালে দুর্বল, শীর্ণ, কালো
কোন গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে
আম্মার ফোঁপানো কান্নার শব্দ শুনতে পেতাম,
আমি তাকে বেশিদিন আম্মা ডাকতে পারিনি -
আমার বয়স যখন ছয়,
পিতা দ্বিতীয়বার বিবাহ করলেন...
কিছুদিন পর মারা গেলেন আমার আম্মা,
আমার আম্মা ...
আমার পিতার আরও তিন ছেলে ছিল
তাই বোধহয় তিনি আমাকে -
আদর করার মত যথেষ্ট সময় পাননি
নাকী আমি কালো ব'লে ভ্রু কুঁচকাতেন...
আজও জানি না,
একা একা বড় হয়েছি, খুব একা...
বয়স তখন উনিশ ছুঁই ছুঁই...
শেখ মুজিব মুক্তির ডাক দিলেন,
আগুন জ্বলা তার অনবদ্য ভাষণে...
আমার পিতা এই দেবতার মতন ব্যক্তিকে মোনাফেক, কাফের
এবং ইসলামের ঘোরতর শত্রু হিসেবে সাব্যস্ত করলেন,
পাকিস্তান.. পাকিস্তান.. মাতম শুরু করলেন
এপ্রিলের মাঝামাঝি, পাকসেনারা গ্রামে আসতে লাগল
আমার পিতার সেকী উচ্ছ্বাস,
ভীষণ তৎপর হয়ে উঠলেন তিনি...
পাকসেনাদের সামনে তিনি এমনভাবে গলে গলে পড়তেন যে -
ভ্রম হত.. তারা বোধহয় আল্লাহর পাঠানো ফেরেশতা...
এই ফেরেশতাদের ছিল পিশাচের মতন ক্ষুধা.
সব খেত ওরা, স-ব... যাকে সন্দেহ হত, গুলি করে মারত...
মেয়েদের ধরে ধরে খুবলে খেত...
এক দুপুরে পিতা, আমার ছোটখালাকে নিয়ে গেলেন -
পাকসেনাদের ক্যাম্পে, আমি তাকে আর কোনদিন দেখিনি...
আমার জগতটুকু ভীষণ এক আগুনে পুড়িয়ে দিলো কেউ...
আমি সেই রাতিই পালিয়ে গেলাম... যুদ্ধে গেলাম...
আমি তখন রংপুরের পথে,
লোক মারফত জানতে পারলাম -
মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের শাস্তিস্বরূপ
পিতা আমায় ত্যাজ্য ঘোষণা করেছেন,
আর এই মহান কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ -
পাকসেনারা তাকে আলবদর বাহিনীর কমান্ডার বানিয়েছে
আমার পিতা...
যুদ্ধের সেই দিনগুলো আজও চোখের সামনে জ্বলজ্বল...
রক্তের মহাসমুদ্র সাঁতরে আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হ'ল ।
আট মাস পর.. ডিসেম্বরের আঠারো তারিখ..
গ্রামে ফিরলাম আমি,
দেখলাম আমাদের বাড়িটাকে পোড়ানো হয়েছে,
শুনলাম পিতার দ্বিতীয় স্ত্রী, তিন পুত্র কেউ-ই আর বেঁচে নেই,
পিতাকে বেঁধে রাখা হয়েছে.. মেরে ফেলা হবে হয়তো...
পিতা আমায় দেখে চমকে উঠলেন...
তার সমগ্র শরীর কোন এক উচ্ছ্বাসে কেঁপে কেঁপে উঠছিল,
আমি পিঠ সোজা করে দাঁড়ালাম,
ভাবলাম মেরেই ফেলুক.. এই পশুটার শাস্তি হওয়া উচিত...
পরে আর পারিনি...
পিতা স-ব ভুলে গিয়ে আমায় গ্রহণ করতে চাইলেন
কিন্তু আমি তার কাছে আর ফিরে যেতে পারিনি...
আমি এখন এক সুতার কলে কাজ করি,
ভয় এবং দুশ্চিন্তার বিষয় এই, পিতা এখন
মস্ত এক নেতা হয়েছেন, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে
তার এখন বিলাসী জীবন...
মন্ত্রীও নাকি হয়ে যেতে পারেন সামনের নির্বাচনে...
কী করেছি আমি... কত বড় পাপ...
অপরাধবোধে, এখন নিজের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারিনা,
পারিনা...
আমার পিতা এখনও আছেন -
আমি ভুলেও তাকে আব্বা বলে ডাকিনা...
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসীদের হাতে নিহত ষাট লক্ষ পোলিশের উদ্দেশ্যে
যাবার মুহূর্তে আমার প্রেমিকা জিজ্ঞেস করছিল বার বার, আমি ফিরবো কি-না যুদ্ধ শেষে
ওই মুহূর্তে ওর চোখে ছিল কেবল ভয় আর অনিশ্চয়তা
লাইলাকের মতোন ওর হাতে রেখে আমার হাত, আমি হেসেছিলাম একটুখানি
সাহস কিংবা নিশ্চয়তা দেয়ার মত তেমন কিছুই পারিনি বলতে ।
আমরা তখন ডানজিনের পথে, হঠাৎ খবর পেলাম
নাযীরা ঢুকে পড়েছে ওয়ারশ-এ,
ওরা প্রতিটি বাড়ি, দোকান, ইমারত, স্কুল, সরাইখানা ডিনামাইটে উড়িয়ে দিয়েছে
আমার পরিবারের সবাইকে, আমার প্রেমিকাকে ধরে নিয়ে গেছ আউসভিৎসে,
নাযীদের ট্যাংকগুলো যখন পশ্চিম সীমান্ত বিদীর্ণ করছিল
আমাদের পোমোরস্কা ভাইয়েরা তখন ঢাল আর তলোয়ার নিয়ে
কামানের সামনে দাঁড়িয়েছিল নিশ্চিত মৃত্যুকে মেনে, বুক পেতে;
ডানজিন বন্দরে আমরা একশো উননব্বইজন সহযোদ্ধা
নাযীদের শ্লেসুইটগ হরস্টিনকে আটকে রেখেছিলাম টানা সাত দিন,
তবু হয়নি শেষ রক্ষা -
এক মাসের মধ্যে, শুধু ওয়ারশ-এই শহীদ হল আমাদের আড়াই লক্ষ সহযোদ্ধা...
তিন মাসের ভেতর আমাদের মাতৃভূমিকে ওরা ধ্বংসস্তুপে পরিণত করলো...
আমাদের পিতা, মাতা, ভাইকে গ্যাস চেম্বারে পুড়িয়ে মারা হল..
বিষাক্ত গ্যাসের ভেতর একটু নিঃশ্বাসের জন্য আঁচড়ে কামড়ে পাহাড় হ'য়ে থাকা
লাশের স্তুপের উপর আমার প্রেমিকার মুখটা হয়তোবা ফুটে ছিলো কোনো নীল পদ্মের মত...
আমাদের ষাট লক্ষ প্রাণের দামে যে অভ্যুত্থান এলো, তা ব্যর্থ হলো...
সোভিয়েতরা এগিয়ে এলোনা আমরা কমিউনিস্ট নই বলে,
এই বর্বরতাকে ওরা মুছে দিতে চাইলো ইতিহাসের পাতা থেকে,
আমাদের এই ত্যাগ তবু যাবে না মুছে কোনদিন-
মাতলোয়া আর ভিসতুলার শপথ,
ভবিষ্যতের পোলিশদের মনে গাঁথা থাকবে, তারা মনে রাখবে...
নাযীরা হন্তারক আর সোভিয়েতরা বিশ্বাসঘাতক
আমরা ষাট লক্ষ শহীদ, মিশে থাকবো
ওয়ারশ, সাপুত, গিদানস্কের জলে-স্থলে-বাতাসে
বেঁচে থাকবো আমাদের উত্তরসূরীদের অন্তরে...
বয়ে যাবো তাদের ধমনীতে-শিরায়-উপশিরায়...
অনন্তকাল ।।
টীকাঃ-
ডানজিন - জার্মানীর একটি নৌবন্দর
নাযী - নাৎসী (হিটলারের সৈন্যবাহিনী)
ওয়ারশ - পোল্যান্ডের রাজধানী
আউসভিৎস - নাৎসীদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প
পোমোরস্কা - অশ্বারোহী সৈন্যদল (ব্রিগেড)
শ্লেসুইটগ হরস্টিন - জার্মান রণতরী
মাতলোয়া ও ভিসতুলা - পোল্যান্ডের দুটি প্রধান নদী
সাপুত ও গিদানস্ক - পোল্যান্ডের দুটি প্রধান শহর
ওই মুহূর্তে ওর চোখে ছিল কেবল ভয় আর অনিশ্চয়তা
লাইলাকের মতোন ওর হাতে রেখে আমার হাত, আমি হেসেছিলাম একটুখানি
সাহস কিংবা নিশ্চয়তা দেয়ার মত তেমন কিছুই পারিনি বলতে ।
আমরা তখন ডানজিনের পথে, হঠাৎ খবর পেলাম
নাযীরা ঢুকে পড়েছে ওয়ারশ-এ,
ওরা প্রতিটি বাড়ি, দোকান, ইমারত, স্কুল, সরাইখানা ডিনামাইটে উড়িয়ে দিয়েছে
আমার পরিবারের সবাইকে, আমার প্রেমিকাকে ধরে নিয়ে গেছ আউসভিৎসে,
নাযীদের ট্যাংকগুলো যখন পশ্চিম সীমান্ত বিদীর্ণ করছিল
আমাদের পোমোরস্কা ভাইয়েরা তখন ঢাল আর তলোয়ার নিয়ে
কামানের সামনে দাঁড়িয়েছিল নিশ্চিত মৃত্যুকে মেনে, বুক পেতে;
ডানজিন বন্দরে আমরা একশো উননব্বইজন সহযোদ্ধা
নাযীদের শ্লেসুইটগ হরস্টিনকে আটকে রেখেছিলাম টানা সাত দিন,
তবু হয়নি শেষ রক্ষা -
এক মাসের মধ্যে, শুধু ওয়ারশ-এই শহীদ হল আমাদের আড়াই লক্ষ সহযোদ্ধা...
তিন মাসের ভেতর আমাদের মাতৃভূমিকে ওরা ধ্বংসস্তুপে পরিণত করলো...
আমাদের পিতা, মাতা, ভাইকে গ্যাস চেম্বারে পুড়িয়ে মারা হল..
বিষাক্ত গ্যাসের ভেতর একটু নিঃশ্বাসের জন্য আঁচড়ে কামড়ে পাহাড় হ'য়ে থাকা
লাশের স্তুপের উপর আমার প্রেমিকার মুখটা হয়তোবা ফুটে ছিলো কোনো নীল পদ্মের মত...
আমাদের ষাট লক্ষ প্রাণের দামে যে অভ্যুত্থান এলো, তা ব্যর্থ হলো...
সোভিয়েতরা এগিয়ে এলোনা আমরা কমিউনিস্ট নই বলে,
এই বর্বরতাকে ওরা মুছে দিতে চাইলো ইতিহাসের পাতা থেকে,
আমাদের এই ত্যাগ তবু যাবে না মুছে কোনদিন-
মাতলোয়া আর ভিসতুলার শপথ,
ভবিষ্যতের পোলিশদের মনে গাঁথা থাকবে, তারা মনে রাখবে...
নাযীরা হন্তারক আর সোভিয়েতরা বিশ্বাসঘাতক
আমরা ষাট লক্ষ শহীদ, মিশে থাকবো
ওয়ারশ, সাপুত, গিদানস্কের জলে-স্থলে-বাতাসে
বেঁচে থাকবো আমাদের উত্তরসূরীদের অন্তরে...
বয়ে যাবো তাদের ধমনীতে-শিরায়-উপশিরায়...
অনন্তকাল ।।
টীকাঃ-
ডানজিন - জার্মানীর একটি নৌবন্দর
নাযী - নাৎসী (হিটলারের সৈন্যবাহিনী)
ওয়ারশ - পোল্যান্ডের রাজধানী
আউসভিৎস - নাৎসীদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প
পোমোরস্কা - অশ্বারোহী সৈন্যদল (ব্রিগেড)
শ্লেসুইটগ হরস্টিন - জার্মান রণতরী
মাতলোয়া ও ভিসতুলা - পোল্যান্ডের দুটি প্রধান নদী
সাপুত ও গিদানস্ক - পোল্যান্ডের দুটি প্রধান শহর
সোমবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০০৯
আমি একটা শূন্য খাম
(৫মে,২০০৭)
ইচ্ছে করে একটি খাম পাঠাই
তোমার কাছে...
হয়তো একদিন পাঠাবো,
কোন এক সকালে তোমার ঘরের দরজা খুলে
হঠাৎ আবিষ্কার করবে খামটি
অবাক হবে... ভাববে কোত্থেকে এলো,
হলুদ একটা খাম,
তার উপরে বড় বড় অক্ষরে তোমার নাম,
প্রেরকের নাম নেই,
তোমার ভ্রু কুঁচকে যাবে, সেই ভ্রু...
যে পরিমাণ বিরক্তি নিয়ে খামটা খুলবে,
খোলার পর সেটি দ্বিগুণ হবে, কেননা
খামের ভেতর কিছুই নেই, জানি
তখ্খুনি খামটাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে..
জানালার বাইরে, বহু দূরে...
আমি তখন প্রচন্ড রোদের মধ্যে,
মানুষের ভীড়ে হারিয়ে গেছি...
শূন্য একটা খাম..
আমার নবতম সংস্করণ ।।
ইচ্ছে করে একটি খাম পাঠাই
তোমার কাছে...
হয়তো একদিন পাঠাবো,
কোন এক সকালে তোমার ঘরের দরজা খুলে
হঠাৎ আবিষ্কার করবে খামটি
অবাক হবে... ভাববে কোত্থেকে এলো,
হলুদ একটা খাম,
তার উপরে বড় বড় অক্ষরে তোমার নাম,
প্রেরকের নাম নেই,
তোমার ভ্রু কুঁচকে যাবে, সেই ভ্রু...
যে পরিমাণ বিরক্তি নিয়ে খামটা খুলবে,
খোলার পর সেটি দ্বিগুণ হবে, কেননা
খামের ভেতর কিছুই নেই, জানি
তখ্খুনি খামটাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে..
জানালার বাইরে, বহু দূরে...
আমি তখন প্রচন্ড রোদের মধ্যে,
মানুষের ভীড়ে হারিয়ে গেছি...
শূন্য একটা খাম..
আমার নবতম সংস্করণ ।।
কবিতাগ্রস্ত
(০১অক্টোবর,২০০৮)
কবি হবার ইচ্ছে ছিলনা,
কবিতা আমায় ধরলও না,
তবু কেন একটু একটু কষ্ট লাগে...
জারুলপোকায় খেয়ে গেছে, বুকের অনেকখানি
বাকীটুকু নির্বেদ... জ্যোৎস্নায় কিংবা অমাবস্যায়
স্বপ্নঘোর প্রহর শেষে,
অন্ধকারের ব্যবচ্ছেদে,
আবছা আকাশের ছায়ায় খুঁজে পাই-
উইপোকায় কাটা সেই রাতের ডায়েরীটা...
যে নদীর জল ছুঁতে পারিনি কোনদিন
যে পাহাড় অপেক্ষার, তার পাইনি কোন খোঁজ
তার হরেক রঙিন সুখ
আঁচড় কেটে গেছে
ছায়া ফেলে গেছে, সকরূণ রোদ্দুর ।।
কবি হবার ইচ্ছে ছিলনা,
কবিতা আমায় ধরলও না,
তবু কেন একটু একটু কষ্ট লাগে...
জারুলপোকায় খেয়ে গেছে, বুকের অনেকখানি
বাকীটুকু নির্বেদ... জ্যোৎস্নায় কিংবা অমাবস্যায়
স্বপ্নঘোর প্রহর শেষে,
অন্ধকারের ব্যবচ্ছেদে,
আবছা আকাশের ছায়ায় খুঁজে পাই-
উইপোকায় কাটা সেই রাতের ডায়েরীটা...
যে নদীর জল ছুঁতে পারিনি কোনদিন
যে পাহাড় অপেক্ষার, তার পাইনি কোন খোঁজ
তার হরেক রঙিন সুখ
আঁচড় কেটে গেছে
ছায়া ফেলে গেছে, সকরূণ রোদ্দুর ।।
অন্য পৃথিবী
(৩০মে,২০০৭)
দেখলাম, সূর্যটা ডুবে গেল...
সব বুনোহাঁস মারা পড়ল...
আর্তনাদ করে উঠল বিপন্ন ডাহুক,
পৃথিবীটা অন্য রকম,
রাত্রি অন্ধকার, খালবিল ভ'রে ওঠে
গর্ভবতী মাছেদের মৃতদেহে...
শ্বাপদের দল, খুবলে খাচ্ছে হরিণশাবকের বুক...
ঈশ্বরের গলিত লাশের উপর শকুনের চিৎকার... হাহাকার
কাউকে চিনছেনা না কেউ, কোনদিন চিনবেনা
সবাই উল্লাসে মেতে - হত্যা,খুন,জখমে...
যুগ থেকে যুগান্তরে ।।
দেখলাম, সূর্যটা ডুবে গেল...
সব বুনোহাঁস মারা পড়ল...
আর্তনাদ করে উঠল বিপন্ন ডাহুক,
পৃথিবীটা অন্য রকম,
রাত্রি অন্ধকার, খালবিল ভ'রে ওঠে
গর্ভবতী মাছেদের মৃতদেহে...
শ্বাপদের দল, খুবলে খাচ্ছে হরিণশাবকের বুক...
ঈশ্বরের গলিত লাশের উপর শকুনের চিৎকার... হাহাকার
কাউকে চিনছেনা না কেউ, কোনদিন চিনবেনা
সবাই উল্লাসে মেতে - হত্যা,খুন,জখমে...
যুগ থেকে যুগান্তরে ।।
কবিতা - কষ্ট - বৃষ্টি
(০৮এপ্রিল,২০০৬)
সাদা কাগজের ওপর কিছু শব্দকে নিয়ে খেলছি..
এভাবেই সময়গুলো বেশ কেটে যায়,
আজকাল নিজের সাথে কথা বলতে শিখেছি -
যেহেতু আমার আর কেউ নেই,
একা থাকার কষ্টটা নয়
একা থাকার লোভটাই বোধহয়
ভালো থাকার সব উপাদান বাষ্পীভূত করে দেয়..
সৃষ্টিছাড়া জঘন্য এক মাথার অসুখ বাঁধিয়েছি,
দেই-দিচ্ছি করেও বহুকাল ভালো করে ঘুমোইনি...
আদৌ কি বেঁচে আছি...
বিষয়-আশয় যা ছিল সব ছুঁড়ে ফেলে
পুড়িয়ে দিয়েছি যাবতীয় সুখ..
এরপরও কখনও কখনও পেছনে তাকাই,
ভাবালুতায় বজ্রেরা কানামাছি খেলে..
তারপর, বলা নেই কওয়া নেই
ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি নেমে পড়ে ।।
সাদা কাগজের ওপর কিছু শব্দকে নিয়ে খেলছি..
এভাবেই সময়গুলো বেশ কেটে যায়,
আজকাল নিজের সাথে কথা বলতে শিখেছি -
যেহেতু আমার আর কেউ নেই,
একা থাকার কষ্টটা নয়
একা থাকার লোভটাই বোধহয়
ভালো থাকার সব উপাদান বাষ্পীভূত করে দেয়..
সৃষ্টিছাড়া জঘন্য এক মাথার অসুখ বাঁধিয়েছি,
দেই-দিচ্ছি করেও বহুকাল ভালো করে ঘুমোইনি...
আদৌ কি বেঁচে আছি...
বিষয়-আশয় যা ছিল সব ছুঁড়ে ফেলে
পুড়িয়ে দিয়েছি যাবতীয় সুখ..
এরপরও কখনও কখনও পেছনে তাকাই,
ভাবালুতায় বজ্রেরা কানামাছি খেলে..
তারপর, বলা নেই কওয়া নেই
ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি নেমে পড়ে ।।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)