সোমবার, ২৩ নভেম্বর, ২০০৯

কারমেন এবং রাজহাঁস

এ হচেছ কারমেন এবং রাজহাঁস
রাত গাঢ় হলে হণ্টন এদের স্বভাব
চাঁদের শরীর থেকে অতৃপ্ত আলোগুলো
যখন পুরনো দেয়ালগুলোকে ছাড়তে আর ধরতে থাকে, তখন
নিয়নের অপরূপ ধোঁয়ার ভেতর হাঁটতে থাকে ওরা
কারমেন এবং রাজহাঁস...

অন্ধকারের সুতোয় গাঁথা আছে
এখানে-ওখানে শুয়ে থাকা গলিগুলো
বিশাল কোন এক খাতা থেকে তারপর
নাম ডেকে চলে কেউ, যেহেতু নির্বাচন আসছে;

একটা রসিমন রাস্তার পাশে কি অবলীলায়..
পাল্টে নিল তার শাড়ি,
এইখানে এসে তাই
রিকশাগুলোর গতি কমে যায়...

আব্বাস নামের কেউ একজন ভিক্ষুক
কালাম নামের কেউ একজন হেলপার
আয়েশা নামের কেউ একজন ফুলওয়ালী
অদ্ভুত কুঁকড়ে থেমে যায়
কেননা ও-প্রান্তে প্রবেশ নিষেধ
সরকারী বন্দুক হাতে কিছু নির্বোধ লোক
টহল দেয়, তাদের ভেতর কুচকুচে বীভৎস
কিছু ছায়া, ছোট আগুন জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে
ক্রসফায়ারের আনন্দে উত্তপ্ত...

কেউ বুঝতে চায়নি কখনও
এ শহর কেন কোনদিন কারো নয়
কারণ সবাই কারমেন নয়
সবার রাজহাঁস হয় না
আর কারও পাঁজর অন্ধকারে
জোছনা বিলোতে পারে না..

এরপর রাত বাড়ে..
ধীরে ধীরে -
নর্দমার স্রোতের সঙ্গীত স্পষ্ট হয়..
পরিত্যক্ত একটা গাড়ীর ভেতর একটা কালাম
একটা রসিমনের শরীর থেকে ভালবাসা খুলে নেয়,
বেড়ালের বাচ্চাটা কাঁপতে কাঁপতে মরে যায়..
আর একটা আয়েশা মায়ের মৃত্যুতে ডুকরে ওঠে..
অবশেষে কারমেন এবং রাজহাঁস
অন্ধকার সুতোয় গাঁথা গলিগুলোর চুল
আঁচড়াতে থাকে... ভোর হবার আগ পর্যন্ত...

শেষ রাতের যাত্রা

গলির মোড়ে পৌঁছামাত্র

রাত পৌনে চার

আঁধারের স্বচ্ছ কলজেটাকে খুবলে তুলে

লেপ্টে দেয়া হয়েছে আকাশের শরীরে

মৃত্যুর মতন নিস্তব্ধতা প্রতিটি ল্যাম্পপোস্টে...


নির্জন পথ, সঙ্গ দিচ্ছে

বিদ্যুতের তারে লেগে থাকা প্রতিটি মৃত বাদুড়

ভাঙ্গাচোরা বাসটার গা ঘেঁষে যাই

তার বুকের কষ্ট আর

একটি বেড়ালের শরীর

মিশে আছে নর্দমার ভেতর

কলার খোসা এবং সবজি বিক্রেতার দুঃখের মাঝে


কিছু দূরে

একটা বিলবোর্ডকে ঘিরে কিছু কুকুর পড়ে আছে

কর্পোরেশনের আবর্জনাবাহী গাড়িটা

মাঠের ধারে বিকল,

আবর্জনার স্তুপ তাই ডাস্টবিন ফুঁড়ে

সমস্ত শহরে গন্ধ বিলোচ্ছে..

পথের পাশে তিনটি ভাসমান পরিবার

এবং একটি ঘুমন্ত শিশু

তারপর কেবল অন্ধকার...


হঠাৎ

সেই অন্ধকারের ভেতর ভেসে ওঠে মৃত বন্ধুর মুখ...

পলক ফেলি,

"তুই তো বেঁচেই গেছিস, বন্ধু

আমার যে বড় কষ্ট..

চেয়ে দ্যাখ..

আরো একটি শিশু ঘুমিয়ে পড়েছে,

তার চোখের জল শুকিয়ে যাচ্ছে,

তার বুকের হাড়গুলো তাকিয়ে আছে আমার দিকে,

ওর পাকস্থলিতে ক্ষুধা ওঁৎ পেতে আছে

ঘুম পালালেই জাপটে ধরবে ওকে,

শিশুটি কাকে জাপটে ধরবে বল..."


আবার চলতে হয়

কুয়াশার মধ্যে নিজেকে একলা লাগে...

বন্ধুর মুখটা ধীরে ধীরে মিশে যায়

দেয়ালে লেপ্টে থাকা একটি লাল অক্ষরের ভেতর ।।

শুক্রবার, ১৩ নভেম্বর, ২০০৯

যুবক-যুবতী

।১।

যুবতীকে কেউ দ্যাখেনি,
যুবক সারাটা দুপুর রাস্তার ধারে,
তার বুকপকেটে আগলানো চিঠিখানা
উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠার ঘামে ভিজে উঠেছে,
সস্তা কলমের কালি, জড়ানো হাতের লেখা
যুবকের বুকের কম্পন ;

অজস্র ভুল বানানের মাঝে -
ভালবাসি শব্দটাই অনায়াসে
পড়তে পারে যুবতী,
ঠোঁটখানা হালকা বাঁকায় সে,
বুকের ভেতরটায় কী যে হচ্ছে
স্বয়ং ঈশ্বরও জানেন না,
আলগোছে হাতব্যাগের ভেতর,
নানান জিনিসপত্রের সাথে
মিশে যায় চিঠিখানা ।।


।২।

রেস্তোরাঁ উপচে পড়া ভীড়,
মুখোমুখি যুবক-যুবতী...
যুবতী বলল -
পরশু আমার বিয়ে
লক্ষীটি হয়ে আসবে,
হালকা সবুজ রং-এর মাঝে
হালকা প্রিন্টের একটা শাড়ি
আমার চাই-ই চাই,
নাকী তা-ও পারবেনা...

যুবক মাথা নীচু করে
ছুরি দিয়ে কাটলেট কাটে,
কেবল কাটে, আবার কাটে,
কাটতেই থাকে...
যুবতী আবার বলে -
একী খাচ্ছ না কেন ..
যুবক একবার মাত্র তাকায়
হাসার চেষ্টা করতে করতে বলে-
কাটলেটটায় ঝাল বড় বেশি
খাওয়া যাচ্ছে না..

যুবতী পানির গ্লাস এগিয়ে দেয় ।।

কুয়াশার ভেতর

কুয়াশার ভেতর
অবশিষ্ট উষ্ণ নিঃশ্বাসে
লিখবার ইচ্ছে ছিল
নিতান্ত ছোট একটি বাক্য
নিদেনপক্ষে একটা শব্দ

বুকের পাঁজর ফুঁড়ে
উঠে এল দীর্ঘশ্বাস
পুরনো, শীতল

অসুখ, অসুখ

অনেক অনেক রোদ
ছাই হয় ঝোপ, ফণিমনসার
হঠাৎ হাওয়ায়, শরীর ভিজতে চায়
মেঘ নয়, তার কাছে বৃষ্টি নেই
উড়ে যায় হাওয়াদের প্রেত
মৃত শকুনের পালক
অসুখ, অসুখ

বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০০৯

একটা স্বপ্ন ছিল

একটা স্বপ্ন ছিল
খুব কাছ থেকে কেউ ডাকবে রূদ্র
আর আমি ডাকবো নদী

বুকের খুব ভেতরকার স্বপ্নটুকু বুকের আরও ভেতরে
অভ্যস্ত দীর্ঘশ্বাসে পাশ পিরে শোয়
কেউ কখনো রূদ্র নামে ডাকেনা
আমিও নদী নামে ডাকার মতন কাউকে খুঁজে পাই না..
দিনের পর দিন, হেঁটে হেঁটে কোথায় যেন চলে যায়;
আজ পকেট হাতড়ালে, খুচরো আর ছেঁড়া কয়েকটি নোট
স্বপ্নদের কোন পকেটে যে রেখেছি..
লোকাল বাস, মানুষের স্তুপ,
এরকাঁধ, ওর মাথা, তার চোখ - কপাল
আধুনিকার ঠোঁট, ঝগরুটের বুক
আমিতো এভাব দাঁড়াতে চাইনি..
ভাবতে ভাবতে স্টপেজ এসে যায়,
কেউ একজন উঠে গেলে বসে পড়ি,
বসে বসে ভাঙ্গাচোরা স্বপ্নদের জোড়া দিই,
আবার ভেঙ্গে যায় ওরা,
হাতে নিই, স্বপ্নদের চুলে বিলি কাটি.. আদর করি..
হঠাৎ সহযাত্রীর ধাক্কায় পড়ে যায় ওরা.. হারিয়ে যায়..
মানুষের ভীড়ে তাদের আর খুঁজে পাইনা ..

সেই তো একটা স্বপ্ন ছিল.. হারিয়ে গেলো..
বুকের মধ্যে মাথা গুঁজে কেউ একজন ডাকবে রূদ্র,
আর আমি - নদী ।

কালকেউটে সুখ অথবা দুঃখ

বুকটা যে কারণে অগ্রাণের হাওয়ার মতন কাঁদছিল
একই কারণে আজ তুমি-আমি-আমরা সবাই
পৃথক-বিচ্ছিন্ন-বিযোজিত
দুপুরের বয়স বাড়তে বাড়তে হাওয়া ওড়না পাল্টায়
বিগলিত অগ্রাণ রোদ অস্থির
এর অন্তঃস্থিত পুরনো বাষ্পীভূত কষ্টগুলো
নতুন রূমালে দাগ কাটে
কে না জানে
ঘাম আর কান্নার দাগ মেশে না কোনদিন।
হঠাৎ সশব্দে জাগে বুকরে ভেতরটা
নতুন প্রেমের গন্ধে আজও মেতে উঠতে চায়
অবশিষ্ট অনস্থমজ্জার কাঠামো
এখন নিশুতি গন্ধ বাতাসেতে
অমাবস্যা এলেও জানি চরকা কাটেনা চাঁদবুড়ি
নকল সুখের উত্তাপে ভিজে ওঠে দেহের অন্দরমহল
কালকেউটে সুখ অথবা দুঃখ...